আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। শিল্পসমৃদ্ধ নরসিংদী জেলার ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী ও কতিপয় স্বতন্ত্র প্রার্থী কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন তার ওপর নির্ভর করছে বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনি ফলাফল। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের হাতের মুঠোয় থাকা এসব আসনে প্রার্থীরা বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও বিজয়ের ট্রাম্প কার্ড হয়ে উঠতে পারেন আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা।নরসিংদী জেলার ৫টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ৪১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নরসিংদী-১ (সদর) আসনে ৮ জন, নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে ৬ জন, নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে ৮ জন, নরসিংদী-৪ (মনোহরদী–বেলাব) আসনে ৯ জন এবং নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে ১০ জন প্রার্থী রয়েছেন।প্রার্থীরা এখন নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন এবং দিচ্ছেন বিভিন্ন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। কেউকেউ অবকাঠামো উন্নয়ন, নরসিংদীতে একটি অত্যাধুনিক মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং দুর্গম চরাঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চলমান হত্যা, দলাদলি ও সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানার চেষ্টা করছেন।তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এবারের নির্বাচনে নরসিংদী-১ (সদর) আসনে চিনিশপুর গ্রাম থেকে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ গ্রামের বাসিন্দা বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি, বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন; জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহিম ভূঞা এবং একই গ্রাম থেকে গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী শিরিন আক্তার।এবারের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইব্রাহিম ভূঞার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন বিএনপির খায়রুল কবির খোকন।সদর আসনে জামায়াতে ইসলামীর দৃশ্যমান ভোট সংখ্যা কম থাকলেও, দলটির কর্মী ও সমর্থকরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখেন। এ ছাড়া তারা অন্যান্য দল ও সাধারণ ভোটারদেরও টানতে পারেন। তবে আওয়ামী লীগের ভোট জামায়াতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ ভোটগুলো জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীকে সুবিধা দিতে পারে।অন্যদিকে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, দলে অপ্রত্যাশিত কোন্দল ও মান–অভিমান রয়েছে, যা অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। হামলা, মামলা, খুন—খারাপি কোনো কিছুই বাদ যায়নি। এসব ভুলে দলীয় শতভাগ ভোটারকে কেন্দ্রে আনতে না পারলে বিপদ ঘটতে পারে। এতে পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব–নিকাশ। তাই বিএনপি প্রার্থীর সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইব্রাহিম ভূঞা বলেন, ‘এলাকা ঘুরে জনগণের সমস্যা জানার চেষ্টা করেছি। স্থায়ীভাবে এখানে বসবাসের কারণে জনগণের চাওয়া–পাওয়ার সঙ্গে আমি পরিচিত। ইতোমধ্যে ১৫টি সমস্যা চিহ্নিত করে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছি। সুষ্ঠু ভোট হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আমাকে জনগণ বিজয়ী করবে বলে আমি আশাবাদী।’বিএনপি প্রার্থী খায়রুল কবির খোকন বলেন, ‘নরসিংদী জেলা বিএনপির একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে এখানকার পাঁচটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। এবারও সব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। এক কথায়, জেলার পাঁচটি আসনে বিএনপি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।’নরসিংদী-২ (পলাশ): এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।তার প্রতিদ্বন্দ্বী সদ্য গঠিত নতুন দল এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী তরুণ নেতা গোলাম সারোয়ার (তুষার)। নতুন প্রার্থী হলেও তিনি এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত করেছেন।তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায় এবং প্রচারণায় তরুণদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন।’ তবে ১১ দলীয় জোটের একটি অংশ মনে করে, জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. আমজাদ হোসেনকে মনোনয়ন দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও শক্ত হতো।পলাশ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘ড. আব্দুল মঈন খান একজন সৎ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তার বাবা প্রয়াত খাদ্যমন্ত্রী মোমেন খান ছিলেন নরসিংদীর উন্নয়নের রূপকার। ড. মঈন খানও মন্ত্রী ও তিনবারের সংসদ সদস্য হিসেবে পলাশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন, যা মানুষ ভুলে যায়নি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় পলাশবাসী তাকে বিজয়ী করতে কাজ করছে।’নরসিংদী-৩ (শিবপুর): এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নরসিংদী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনজুর এলাহীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার রাজনৈতিক শিষ্য আরিফুল ইসলাম মৃধা।তিনি টানা দুইবার ইউপি চেয়ারম্যান ও একবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে, মনজুর এলাহী বাইরে থেকে এসেছেন—যার সুবিধা পেতে পারেন আরিফুল ইসলাম মৃধা।আরিফুল ইসলাম মৃধা বলেন, ‘আমি কখনো শিবপুর ছেড়ে যাইনি। দল-মত নির্বিশেষে মানুষের পাশে ছিলাম। শিবপুরের মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, তাদের ইচ্ছাতেই আমি প্রার্থী হয়েছি।’মনজুর এলাহী বলেন, ‘শিবপুরের মানুষ আমাকে ভালোবাসে বলেই ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। ভবিষ্যতেও উন্নয়নে পাশে থাকব।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের ভোটাররা জানান, তারা জামায়াত বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নয়, বিএনপি প্রার্থী মনজুর এলাহীকেই ভোট দেবেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি
ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২৬
0
Tags


